You are currently viewing দেখে আসুন ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ: চেরাপুঞ্জির কাছে এক অনন্য প্রাকৃতিক বিস্ময়

দেখে আসুন ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ: চেরাপুঞ্জির কাছে এক অনন্য প্রাকৃতিক বিস্ময়

  • Post author:Suvankar Das
  • Post last modified:আগস্ট 28, 2025
  • Post comments:0 Comments

মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি — নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ ভ্রমণ গন্তব্য; তবে জেনে রাখুন, সবুজে মোড়া পাহাড়ি পথ বেয়ে ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজের ট্রেকিংটা না করলে চেরাপুঞ্জি ভ্রমণটা অসম্পূর্ণই থেকে যায় (Double Decker Root Bridge Trek)। যাত্রাটি কিছুটা কঠিন হলেও মেঘালয়ের চিরহরিৎ অরণ্যের ভেতর দিয়ে এই রোমাঞ্চকর ট্রেক যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীর জীবনে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

Read in English >>

এই দীর্ঘ দিনভর যাত্রায় আপনি পাবেন মেঘ-বৃষ্টিতে মোড়া সবুজ অরণ্যের সৌন্দর্য, শত ফিট উঁচু ঝুলন্ত সেতু পার হওয়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, রঙিন প্রজাপতির স্বপ্নউড়ানের দৃশ্য, ঝরনার গর্জন আর স্বচ্ছ জলধারা। সর্বোপরি এই যাত্রার পরম সৌন্দর্য বিরাজ করে নংগ্রিয়াট গ্রামে—প্রকৃতি আর মানবজাতির যৌথ উদ্যোগে সৃষ্ট ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ—যার সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্যই এই যাত্রা। তবে রোমাঞ্চ এখানেই শেষ নয়, যদি আপনার আরো কিছুটা হেটে চলার ক্ষমতা থাকে, তাহলে এগিয়ে যান ন্যাচারাল সুইমিং পুলের দিকে (Natural Swimming Pool), আর তার কিছুটা পরেই পাবেন রোমাঞ্চকর রেইনবো জলপ্রপাত (Rainbow Falls)।

সুতরাং যদি আপনার পরবর্তী গন্তব্য মেঘালয় বা চেরাপুঞ্জী হয়, এবং আপনি এক অবিস্মরণীয় অ্যাডভেঞ্চারের ট্রিপের সন্ধানে থাকেন, তাহলে এই গল্পটি এক্কেবারে আপনার জন্যই লেখা; থুড়ি, গল্পকথা একেবারেই নয়, বরং একেবারে সশরীরে উপলব্ধি করা এক ভ্রমণগাথা, যার মাধ্যমে আপনি পেয়ে যাবেন ডাবল ডেকের রুট ব্রিজ ট্রেকিঙের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ, এবং পলকের মধ্যে সাজিয়ে ফেলতে পারবেন আপনার নিজের ভ্রমণ পরিকল্পনাটিও (Double Decker Living Root Bridge Trek Plan)।

লিভিং রুট ব্রিজ কী?

জীবন্ত শিকড়ের সেতু বা লিভিং রুট ব্রিজ হলো মানুষের তৈরী এক প্রাকৃতিক বিস্ময়! এধরণের জীবন্ত শিকড়ের সেতু মেঘালয়ে অনেক আছে মেঘালয়ের খাসি ও জয়ন্তীয়া জনজাতি প্রাচীন রাবার গাছের বাতাসে বেড়ে ওঠা মূল ব্যবহার করে এই সেতুগুলি তৈরি করেন। এই সেতুগুলি প্রচন্ড টেকসই ও স্বয়ং-বর্ধক; উল্লেখ্য, এই সেতুগুলি মেঘালয়ের দীর্ঘ বর্ষার জন্য কাঠের বিকল্পের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই।

মেঘালয়ের খাড়া পাহাড়ে রাস্তা তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই বহুবছর আগে স্থানীয় মানুষরা গাছের মূলকে নদীর এক দিক থেকে অন্য দিকে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য একে ওপরের সাথে জুড়ে দেন। ধীরে ধীরে সময়ের সাথে এই মূলগুলো বেড়ে ওঠে ও প্রচন্ড শক্ত হয়ে ওঠে ও ভারবহনকারী সেতুতে রূপ নেয়। হাতে গোনা শক্তিবৃদ্ধির মাধ্যমে এগুলো ১৩–১৫ বছরে হাঁটার উপযোগী হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীকালে আরোও বৃদ্ধি পেয়ে ৫০০ বছরেরও বেশি টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে।

নংগ্রিয়াটে অবস্থিত ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ—যা আমাদের আলোচনার মূল বিষয়—এর বয়স ১৫০ বছরেরও বেশি, যদিও এর সঠিক বয়স অজানা।

ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ ভ্রমণ গাইড

১. যাত্রার সূচনা

ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজের ট্রেক শুরু হয় তীর্না গ্রাম (Tirna Village) থেকে; গ্রামটি চেরাপুঞ্জি (বা সোহরা) থেকে প্রায় এক ঘণ্টার গাড়ি পথ। আপনি চাইলে—

  • সকালে চেরাপুঞ্জি থেকে রওনা হয়ে তীর্না পৌঁছাতে পারেন। সেক্ষেত্রে apnake সকাল ৬ টার মধ্যে চেরাপুঞ্জী থেকে বেরোতে হবে।
  • অথবা তীর্নায় রাত কাটিয়ে সকাল ৮টার মধ্যে ট্রেক শুরু করতে পারেন।
Double Decker Living Root Bridge hiking route

তীর্না গ্রাম থেকে ট্রেক শুরু করে রুট ব্রিজ ঘুরে  আবার তীর্না ফিরে আসতে সময় লাগে গড়ে ৭–৯ ঘণ্টা; নির্দিষ্টভাবে সময় বলা সম্ভব নয়, কারণ আপনার গতি ও বিরতির উপর পুরোটা নির্ভর করে। এটি প্রচলিত পাহাড়ি trek যেমন হয় তেমনটা ঠিক নয়—শুরু থেকেই খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতে হয়, যা নিম্নগামী হলেও বেশ কষ্টসাধ্য হতে পারে। উল্লেখ্য, স্থানীয় মানুষজন নিয়মিত এই পথে চলাফেরা করেন, বিচ্ছিন্ন অঞ্চল থেকে শহরের সাথে যোগাযোগ রাখতে তাঁদের এই পথ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

💡 টিপস: খাড়া সিঁড়ির জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকুন—এটি সাধারণ ট্রেকিংয়ের চেয়ে অন্যরকম; আমাদের বেশ কঠিন বলেই মনে হয়েছে।

২. প্রথম বিরতি: রিটিমেন রুট ব্রিজ

মেঘালয়ের ঘন অরণ্যের ভেতর দিয়ে হাঁটার মধ্যে দিয়ে সত্যিই এক অন্য রকম আনন্দ অনুভব করা যায়। এখানে আপনি পাবেন শান্ত পরিবেশ, ঝরনার দৃশ্য, প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর শব্দ আর অজানা উদ্ভিদের ভেতর দিয়ে উড়ন্ত রঙিন প্রজাপতির মনোহরা দৃশ্য।

প্রায় ৫০–৬০ মিনিট ট্রেকের পর আপনি পৌঁছে যাবেন নংথিমাই গ্রামে অবস্থিত রিটিমেন রুট ব্রিজে। এটি স্থানীয়ভাবে সিঙ্গেল রুট ব্রিজ নামেও পরিচিত। যারা এইপথে সংক্ষিপ্ত ট্রেক করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার গন্তব্য। এটিও একটি জ্যান্ত শিকড়ের সেতু, তবে ডাবল ডেকার নয়; লোনবে থেকে অনিচ্ছুক হলেএই সেতুটি দেখে আপনি আবার ফিরে যেতে পারেন।

Single layer root bridge on the way to Double Decker Root Bridge
Single layer root bridge

সিঙ্গেল রুট ব্রিজের পাশেই দেখতে পাবেন আরোও একটি অস্থিতিশীল রুট ব্রিজও রয়েছে, মানে সেটি এখনো হেঁটে চলার মতো শক্তপোক্ত হয়নি।

৩. আবারও শুরু জঙ্গল পথে হন্টন — সঙ্গে নানান বিস্ময়

সিঙ্গেল রুট ব্রিজ থেকে নংগ্রিয়াট গ্রামে পৌঁছানোর ট্রেক পথ আরও খাড়াভাবে নিচের দিকে নামে; অধিকাংশ জায়গাতেই সিঁড়ি আছে, তবে খাড়া সিঁড়ি দিয়ে ক্রমাগত নিচে নেমে চলাটাও মাঝেমধ্যে বেশ কঠিন হয়ে ওঠে। তবে, প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টার এই যাত্রা যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনিই মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতাও দিয়ে থাকে। পথজুড়ে পাবেন—

  • একাধিক বাঁশের তৈরী ও শিকড়ে বাঁধা ব্রিজ,
  • প্রবাহমান নদীর উপর ঝুলে থাকা তারের নড়বড়ে ঝুলন্ত সেতু, যা ভ্রমণে বাড়তি রোমাঞ্চ যোগ করে,
  • অনেক নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ নীল জলধারার অপরূপ দৃশ্য,
  • আর চিরসবুজ অরণ্যের মোহময় সৌন্দর্য।

💡 টিপস: দীর্ঘ পথের কারণে মাঝপথে ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক। আমাদের দলেরই একজন সিঙ্গেল রুট ব্রিজ দেখার পর আর এগোতে পারেননি। তবু আমি বলব—লিভিং রুট ব্রিজ হলো এক অনন্য প্রাকৃতিক বিস্ময়, তাই মনকে দৃঢ় রেখে এগিয়ে যান। এই যাত্রার শেষে আপনি যখন ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ (Double Decker Root Bridge) দর্শন করবেন, আপনার বাস্তবেই মনে হবে, “পরিশ্রম সার্থক”! প্রতি বছরই বহু পর্যটক—এমনকি ৫০ বছর বয়সোর্দ্ধ ভ্রমণপ্রেমীরাও অদম্য সাহস ও ধৈর্যের সাথে এই ট্রেকটি সফলভাবে সম্পন্ন করেন।

যদি বিশ্রামের প্রয়োজন হয়, সিঙ্গেল রুট ব্রিজের কাছে একটু বসে নিন। এখানে দু একটা দোকান পাবেন, সেখানেই হালকা টিফিন বা এনার্জি ড্রিঙ্ক আপনাকে আবারও যাত্রার জন্য প্রস্তুত করে তুলবে।

৪. ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ: এক প্রাকৃতিক বিস্ময়

নংগ্রিয়াট গ্রামের বিখ্যাত ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ (Double Decker Root Bridge) প্রায় দেড় শতাব্দীরও পুরনো মানুষের সৃষ্ট এক প্রাকৃতিক আশ্চর্য, এই সেতু দর্শন এক বিরল অভিজ্ঞতার সমান। যদিও ট্রেকের পথে একাধিক রুট ব্রিজ দেখা যায়, এটি একমাত্র দ্বিস্তর বিশিষ্ট সেতু—আর এর দ্বিস্তরীয় নির্মাণের পেছনেও রয়েছে এক আকর্ষণীয় কারণ।

বর্ষাকালে সেতুর নীচের জলধারা এতটাই ফুলে ওঠে যে প্রায়ই নীচের স্তর ডুবে যায়, ফলে দু’পাড়ের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। এই সমস্যার সমাধানে খাসি গ্রামবাসীরা একই কৌশল ব্যবহার করে উপরে আরও একটি স্তর তৈরি করেন, যাতে প্রবল বর্ষাতেও যাতায়াত বন্ধ না হয়।

সেতুদর্শনের পাশাপাশি, এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্যও অতি মনোরম—

  • সেতুর উপর দাঁড়িয়ে সামনেই দেখতে পাবেন এক অবিরাম ঝর্ণা,
  • নিচে প্রবাহমান স্বচ্ছ জলের ধারা,
  • চারদিক জুড়ে শান্ত সবুজ প্রকৃতি, যা আপনাকে শহুরে কোলাহল থেকে বহুদূরে এক অন্য জগতের সন্ধান দেয়।

আপনি এমন প্রশান্ত পরিবেশে মাঝে বসে অনায়াসেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারেন—ঝরনার নিচে স্নানে মগ্ন হতে পারেন, স্বচ্ছ জলে হেঁটে বেড়াতেও পারেন, কিংবা শুধু প্রকৃতির নীরবতা উপভোগ করতে পারেন। সময় যেন এখানে থমকে দাঁড়ায়; তবে আপনার সময় সীমিত, তাই প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করতে ভুলবেন না।

বিঃ দ্রঃ – ডাবল ডেকার রুট ব্রিজের কাছে পৌঁছালে একটা ছোট্ট অফিস দেখতে পাবেন; সেখানে প্রবেশমূল্য হিসেবে প্রতিজনকে ১০ টাকা জমা করতে হয় (Double Decker Root Bridge Entry fee)। ডিজিটাল বা ভিডিও ক্যামেরার জন্য অতিরিক্ত চার্জ প্রযোজ্য, তবে স্মার্টফোন একেবারেই বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারেন।

৫. এগিয়ে যান সামনের দিকে, প্রাকৃতিক সুইমিং পুলের উদ্দেশ্যে

ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় কাটানোর পর আপনার সামনে দু’টি পথ—এক, পিছনের দিকে, অর্থাৎ তির্না বা চেরাপুঞ্জীতে ফিরে যাওয়া, দুই, আরও কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে আরোও কিছু প্রাকৃতিক বিস্ময়ের সাক্ষী থাকা।

আমরা দ্বিতীয় পথেই এগিয়েছিলাম, কারণ আর কিছুটা এগিয়ে গেলেই পড়বে প্রাকৃতিক সুইমিং পুল (Natural Swimming Pool)।

রুট ব্রিজ থেকে এই স্পটে পৌঁছতে প্রায় ৪০ মিনিট সময় লাগে, আরোও ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এই পথ, তবে চড়াই উৎরাই কিছুটা কম।

পথে আরও দুটি সেতু পার হতে হয়—একটি জীবন্ত মূলের, অন্যটি তারের ঝুলন্ত ব্রিজ।

প্রাকৃতিক এই সুইমিং পুল সত্যিই অপূর্ব। এক ঝরনা এসে পড়ে স্বচ্ছ নীল জলাধারে, আর এই জলাধারের শীতল স্বচ্ছ্ব জল স্নানের জন্য সত্যি আদর্শ। আবার এখানে বসে প্রকৃতির মাঝে আপনি একটু জিড়িয়েও নিতে পারেন। তবে যদি স্নান করেন তাহলে খুব সতর্ক থাকুন— জলাশয়ের মধ্যভাগ বেশ গভীর আর ওই জায়গায় স্রোতও প্রবল। তাই স্নান করলে পারে কাছাকাছিই থাকুন, এখানে আপনাকে বাঁচানোর জন্য কাউকে পাবেন না।

Natural Swimming Pool - explore during Double Decker Root Bridge trek .

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এতো সুন্দর জায়গাটি খুব কম পর্যটকই দেখতে পান—মূলত বিদেশি ট্যুরিস্টরা, যাঁরা ঘোরার আগে ভালোমতো ব্লগ পড়েন বা দেখেন, তারাই এখানে আসেন; বেশিরভাগ ভারতীয় পর্যটক এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের খবরই রাখেন না। তবে না বললেই নয়, এই “না-জানা”-ব্যাপারটি, এই স্থানটির নির্জনতা এবং নির্মলতাকে বজায় রাখে এবং উটকো ভিড়ের হাত থেকে মুক্ত রাখে।

সময় থাকলে অন্তত এক ঘণ্টা এখানে কাটান।

৬. আরও আবিষ্কার করুন: রেইনবো ফলস

ট্রেকের শেষ ধাপ আপনাকে নিয়ে যাবে মনোমুগ্ধকর রেইনবো জলপ্রপাতে; এ জায়গাটি ন্যাচারাল সুইমিং পুল থেকে প্রায় ১.২ ঘণ্টার পথ। অনেকেই ক্লান্তি বা সময়ের অভাবে এখানে পৌঁছাতে পারেন না, তবে এই নির্জন সৌন্দর্য একেবারেই অনন্য।

এই সুউচ্চ জলপ্রপাতের নামকরণ হয়েছে এক বিশেষ কারণে—যখন সূর্যের আলো জলপ্রপাতের জলের সূক্ষাতিসূক্ষ কণা দ্বারা সৃষ্ট কুয়াশার উপর পড়ে, তখন সৃষ্টি হয় রঙিন রামধনুর। এদৃশ্য একবার চোখে পড়লে বিস্ময়ে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না।

তবে এই দৃশ্য দেখতে হলে অবশ্যই সূর্যাস্তের আগে পৌঁছাতে হবে, সূর্যের নির্দিষ্ট কৌণিক অবস্থান বাঞ্ছনীয়, আর আকাশ পরিষ্কার থাকা চাই। শীত কিংবা বসন্তকাল এখানে ভ্রমণের জন্য সেরা সময়—তখন রামধনু সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

খুবই অল্প কয়েকজন পর্যটক এখানে আসেন, অনেকটা দূর হলেও এই জায়গাটি নিঃসন্দেহে অসাধারণ।

ঘরে ফেরা

দিনভর ট্রেক শেষে তির্না গ্রামে ফেরার পথ নিঃসন্দেহে কঠিন, কারণ ফিরতি পথের বেশিটাই চড়াই। রেইনবো জলপ্রপাত থেকে তির্নায় ফিরতে প্রায় ৩–৪ ঘণ্টা সময় লাগে। যদি পুরো দিনের ট্রেক অতিরিক্ত ক্লান্তিকর মনে হয়, তবে আগেভাগেই নংগ্রিয়াট গ্রামের কোনো সাধারণ হোমস্টে বুক করে রাত কাটাতে পারেন এবং পরের দিন ফিরে আসতে পারেন।

শিশু বা নবজাতক নিয়ে ফিরতি ট্রেক আরও কঠিন হয়ে ওঠে যদি বাড়তি সহায়তা না থাকে। এ অবস্থায় অবশ্যই একজন পোর্টার ভাড়া নেওয়ার কথা ভাবুন, বিশেষত ফেরার পথে খাড়াভাবে উঁচুতে ওঠার ক্ষেত্রে। আমরা আমাদের দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে এই ট্রেক করেছিলাম এবং ফিরতি পথে পোর্টারদের সাহায্য নিয়েছিলাম।

Thanks to the proter for carrying our baby a long way during the return journey from Double Decker Living Root bridge
Thanks to the proter for carrying our baby during the return journey

কোনো শিশুই স্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ সময় কোনো অপরিচিতের সঙ্গে থাকতে চাইবেনা, আমাদের সন্তানও পুরো সময় থাকতে চায়নি, তবুও পোর্টারের বলে রাখি, পোর্টের সাহায্য ছাড়া এই চড়াই পথে যাত্রা বেশ কঠিন।

আমাদের শিশুকে কোলে পিঠে নিয়ে ফিরতি পথে সহযোগিতার জন্য পোর্টারকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ।

ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজের আশেপাশের গ্রামীণ জীবন

মেঘালয়ে রুট ব্রিজ মোটেই বিরল নয়, তবে ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ (Double Decker Root Bridge) সবচেয়ে সুন্দর ও জনপ্রিয়। পর্যটকদের কাছে এটি এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হলেও স্থানীয় গ্রামবাসীর কাছে এটি জীবনরেখা। এই সেতুই তাদের মূল বাজারে যাওয়ার একমাত্র সংযোগপথ, আর তারা প্রায় প্রতিদিনই এই খাড়া পথে ওঠানামা করে থাকেন।

পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করে সরকার তাদের দৈনন্দিন দুর্ভোগ কমাতেই পারত, কিন্তু হয়তো পর্যটন-আকর্ষণ ধরে রাখার জন্য তা এখনও হয়নি। বর্তমানে পর্যটন ও হোমস্টেই-ই তাদের প্রধান জীবিকা।

কারা ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ দেখতে যাবেন?

যদি মেঘালয়ে আসেন, বিশেষত চেরাপুঞ্জি ভ্রমণে, তবে ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ মিস করবেন না—এই যাত্রাটি নিঃসন্দেহে জীবনের এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। তবে দুঃখজনকভাবে, সবার শারীরিক অবস্থা এই ট্রেক করার উপযোগী নাও হতে পারে।

  • শারীরিকভাবে সক্ষম ভ্রমণকারী: অ্যাডভেঞ্চারটি আপনাকে আনন্দ দেবে।
  • বয়স্ক ভ্রমণকারী: সাহস ও ধৈর্য থাকলে আপনিও পৌঁছে যেতে পারেন। যদি সন্দেহ হয়, সিঙ্গেল রুট ব্রিজ দেখে ফিরে আসতে পারেন।
  • স্বাস্থ্য সমস্যাযুক্ত ভ্রমণকারী: হাঁপানি, হিস্টেরিয়া ইত্যাদি সমস্যায় ভুগলে ট্রেকটি এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়; এর পরিবর্তে মেঘালয়ের অন্যান্য মনোরম স্থান ঘুরে দেখতে পারেন।

👉 যদি আপনি Completely সুস্থ হন, তবে ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ অবশ্যই ঘুরে আসা উচিত।

ভ্রমণের সেরা সময় (Best Time to Visit Double Decker Root Bridge)

ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ ভ্রমণের জন্য আদর্শ সময় হলো নভেম্বর থেকে এপ্রিল—এই সময় আবহাওয়া ঠান্ডা ও শুষ্ক থাকে এবং ট্রেকের জন্য একদম আদর্শ। শরৎকালীন উৎসব ও গ্রীষ্মকালীন ছুটির কারণে অক্টোবর ও মে মাসও জনপ্রিয়।

শীতকালে ভ্রমণের বিশেষ আকর্ষণ হলো স্বচ্ছ নীল জলাশয় এবং রেইনবো ফলসে রামধনুর দৃশ্য। তবে এ সময় মেঘালয়ের বেশকিছু ঝরনা শুকিয়ে যায়।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর ঘোর বর্ষাকাল, এসময়ে এই ট্ৰেকিং এড়িয়ে চলাই ভালো। তবে, বৃষ্টি ও সবুজ প্রকৃতি যদি আপনাকে টানে, তবে মেঘালয় বর্ষার সময়ও এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। কিন্তু এসময় ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ ট্রেক (Double Decker Root Bridge trek) করা ঝুঁকিপূর্ণ—পিচ্ছিল পথ, উত্তাল নদী ও ঝরনা, আর অনাকাঙ্ক্ষিত কীটপতঙ্গ ও সাপের উপস্থিতি আপনার পরিকল্পনা নষ্ট করতে পারে।

কীভাবে পৌঁছবেন? (How to Reach Double Decker Root Bridge)

ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ মেঘালয়ের পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার নংগ্রিয়াট গ্রামে, চেরাপুঞ্জির কাছেই অবস্থিত। ট্রেক শুরু হয় তির্না গ্রাম থেকে।

🚉 রেলপথে:

  • মেঘালয়ে কোনো সরাসরি ট্রেন নেই।
  • গৌহাটি (অসম) রেলস্টেশনে নেমে ক্যাবে শিলং, তারপর চেরাপুঞ্জি এবং শেষে তির্না পৌঁছাতে হবে।

✈️ বিমানপথে:

  • গৌহাটি বিমানবন্দর: ভারতের প্রায় সব বড় শহর ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত। সেখান থেকে ক্যাবে শিলং যেতে হবে।
  • শিলং বিমানবন্দর: কেবল কলকাতা থেকে দৈনিক একটি ফ্লাইট চলে। খারাপ আবহাওয়ায় ফ্লাইট প্রায়ই বিলম্বিত বা বাতিল হয়।

শিলং থেকে ক্যাবে তির্না পৌঁছে যেতে পারেন। আপনার কাছে দুটি বিকল্প থাকবে:

  • তির্নায় রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে ট্রেক শুরু করা।
  • অথবা চেরাপুঞ্জি থেকে ভোরে রওনা দিয়ে টিরনায় গিয়ে ট্রেক শুরু করা।

কোথায় থাকবেন? (Where to Stay Near the Living Root Bridge)

আপনার তিনটি বিকল্প রয়েছে:

  1. চেরাপুঞ্জি /সোহরা:
    • আরামদায়ক রিসর্ট ও হোমস্টে পাওয়া যায়।
    • ভোরে বেরোলে গাড়িতে প্রায় ১ ঘণ্টায় তির্না পৌঁছানো যায়।
  2. তির্না গ্রাম (প্রস্তাবিত):
    • ট্রেক শুরু করার সবচেয়ে কাছের জায়গা।
    • সাধারণ হোমস্টে, বিলাসিতা কম হলেও ট্রেকের আগে বিশ্রামের জন্য আদর্শ।
  3. নংগ্রিয়াট গ্রাম:
    • ডাবল ডেকার রুট ব্রিজের সবচেয়ে কাছের জায়গা।
    • কাছেই প্রাকৃতিক সুইমিং পুল ও রেইনবো ফলস ঘুরে দেখার সুযোগ।
    • সাধারণ হলেও পরিচ্ছন্ন হোমস্টে আছে—যা আপনাকে গ্রামীণ জীবনের স্বাদ দেবে। বিদেশিরা এখানে থেকেই পুরো জায়গাটির প্রকৃত স্বাদ নিয়ে থাকেন।

📌 মনে রাখবেন, নংগ্রিয়াট দূরবর্তী গ্রাম, তবে অনেক অভিযাত্রী এখানে রাত কাটাতে পছন্দ করেন যাতে ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ, প্রাকৃতিক পুল ও রেইনবো ফলস আরাম করে ঘুরে দেখা যায়।

💡 টিপস: প্রথম রাত কাটান টিরনায়, আর রেইনবো ফলস দেখে দ্বিতীয় রাত থাকুন নংগ্রিয়াটে—তাহলে ফেরার পথে ক্লান্তি অনেকটাই কমে যাবে।

🌿 Happy Hiking!
কোনো প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞেস করুন—আপনাকে সাহায্য করতে পারলে আনন্দিত হব।

👉 যদি এই গাইডটি আপনার উপকারে আসে, তবে অবশ্যই শেয়ার করুন এবং মন্তব্য করে জানাতে ভুলবেন না।

দেখে আসুন ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ: চেরাপুঞ্জির কাছে এক অনন্য প্রাকৃতিক বিস্ময়
Home |  Articles

মন্তব্য করুন